শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৩

"অন্ধকারের প্রান্তর, অসমাপ্ত প্রতিক্ষা- একটি ভূতের গল্প"

 








এম,আমিনূর রহমান।


হতচ্ছড়া বৃষ্টি যেন আজ পিছু ছাড়ছে না।অঝোর ধারায় ঝরেই চলেছে।ঘরে থাকলে ওস্তাদ গোলাম আলীর কন্ঠে মেঘ-মল্লার শুনতাম।কিন্তু ভিজে পড়ে ২ কিলোমিটার হাটতে হবে এই বৃষ্টির মাঝে তাতেই মনটা খরাপ হয়ে যাচ্ছে।গ্রামের মাটির রাস্তা কাদা হবে তো নিশ্চিৎ,কিন্তু উপায় নেই বাড়ী যেতেই হবে।পূব আকাশটা একটু ফর্সা লাগছে,একটু অপেক্ষা করি যদি বৃষ্টি থামে।একটি দোকানের ঝাপেরনিচে দাড়িয়ে আছি।দোকানী লোকটা মাল পত্র গুছিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই,ছাতাটা দু'তিনবার হাতে নিয়ে আবার রেখে দিয়েছেন।বুঝলাম আমি ঝাপের নিচে দাড়িয়ে আছি বলেদোকান বন্ধ করতে পারছে না।আমার অন্য কোথাও দাড়ানো উচিৎ।

এক দৌড়ে উঠে গেলামএকটি পুরানো দালানে।অনেক প্রাচীন স্থাপনা "কুমুদ চন্দ্র দাতব্যচিকিৎসালয়"চুন সুরকির ১৮ ইন্চী চওড়া প্রাচিরের দেয়ালে খোদাই করে লেখা।"স্থাপিত ১৮৮৪ সন ইং"অনেক কষ্টে এই লেখাটি উদ্ধার করা গেল।বৃষ্টি আরো জোরে শুরু হলো।অস্থির লাগছে কি যে করি বুঝতে পারছি না।ঘড়িতে রাত ১১টা প্রায়।হটাৎ পেছনে কারো আওয়াজ পেয়ে ভূত দেখার মতচমকে উঠলাম।বেশ লম্বা ছিপছিপে গড়নের একটি মেয়ে,হাতে একটি পার্স।

চেহারাটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে ঠিক মনে করতে পারছি না।অনেক চেহারা এমনও থাকে যে দেখলেই চেনা চেনা লাগে,তেমন কেউ হবে হয়তো।সোজা হেটে আমার কাছে চলে এলো,বললো- ভয় পেলি নাকি-আমি বীণা,তোদের সেই- বীণা রানী সাহা।মনে আছে আমার কথা?আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম,বললাম-আরে বীণা তুই এতো রাতে এখানে কি করছিস?সাথে কেউ নেই? ও আমার কথার কোন জবাব না দিয়ে বললো,এ বৃষ্টি থামবার নয় চল হাটা শুরু করি।

আমি বললাম এই বৃষ্টিতে ভিজলে নিশ্চিৎ জ্বরে পড়তে হবে।একটি ছাতাও নেই আমাদের কাছে।

-যা নেই তা নিয়ে আফসোস করে লাভ কি?চল নেমে পড়ি ।চারটে ধাপ সিড়ি নামতেই পুরো ভীজে জবুথবু হয়ে গেলাম।সামনে বীণা আমি পেছনে।রাস্তায় নেমে এলাম,রাস্তাটা খুবই অন্ধকার দু'পাশের লম্বা গাছগুলো মনে হচ্ছে দু'পাশে দু'টো  কালো দেয়াল মাঝখান দিয়ে কর্দমাক্ত পথে অতি কষ্টে আমরা হাটছি।ও আমার থেকে বেশ কিছুটা সামনে চলে গেছে,আমি দ্রুত পা চালিয়ে ওর নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছি এটা বুঝে ও থামলো।কাছে আসতেই বললো-

থাকিতে চরণ মরণে কি ভয় নিমেষে যোযন ফরসা,

মরণ হরণ নিখিল স্বরণ জয় শ্রীচরন ভরসা।

 


বলেই সেই ওর ভূবন ভুলানো হাসিটা ছুড়ে দিলো স্বসব্দে।বীণা স্কুলের সব চেয়ে মেধাবী ছাত্রী ছিলো সাথে সাথে ভীষন বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে।আমার সাথে এই পাঁচ বছর পর দেখা।SSC পাস করে আমি শহরে চলে গেলাম,আর HSC করারপর সোজা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।দেখা সাক্ষাতও হয়নি খোজ-খবরও নেয়া হয়নি।আজ এতো বছর পর দেখা হলো তাও কিনা এভাবে।আমাদের একই গ্রামে বাড়ী।ছোট বেলায় এই পথ দিয়ে স্কুলে যেতাম দু'জনে আরো অনেকের সাথে।কিন্ত ওই ছিলো আমার ভালো বন্ধু যার কাছ থেকে আবহেলা বা তিরস্কার পাইনি কখোনো বরং সহযোগীতা পেয়েছি অনেক।হাটছি তো হাটছি সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঘুটঘুটে অন্ধকার।হটাৎ মনে হলো বীণা আমার কাছাকাছি কোথাও নেই।অনেক্ষন  দু'জনার মধ্যে কোন কথা হচ্ছে না।ওর কোন নড়াচড়ার শব্দও পাচ্ছি না,শুধু নিজের পায়ের সব্দ নিজে শুনছি।

-বীণা ...তুই কই?তোর কোন সাড়া-সব্দ নেই কেন?

দূর থেকে ও চেচিয়ে বললো- একটু দ্রুত পা চালা,যেভাবে হাটছিস তো বাড়ী যেতে ভোর হয়ে যাবে। মনে হলো যেন বহু দূর থেকে ওর গলা ভেসে এলো।আমি দ্রুত পা চালালাম ওর কাছাকাছি পৌছাতে হবে।কিন্তু কোথায় গেল মেয়েটা এখানে বেশ আলো রয়েছে।রাস্তার দু'পাশে কোন গাছ নেই।বৃষ্টিটা ধরে এসেছে তবে বাতাশ আছে ,বেশ ঠান্ডা লাগছে।হটাৎ খেয়াল করলাম বীণা পাশের ধান ক্ষেত থেকে উঠে আমার দিকে আসছে।আমি বললাম ধান ক্ষেতের মধ্যে কি করছিস,কোথায় গেছিলি।ও আমার দিকে না তাকিয়ে বললো-তুই আগে যেমন বোকা ছিলি এখন তার চেয়ে বেশী বোকা হয়েছিস।মেয়েদের নিত্য প্রাকৃতিক কাজের বিষয় জিগ্যেস করতে হয় না,আর তারা বলতেও পারে না।

 

আমি আসলেই একটু বোকা ধরনের মানুষ।ছোট বেলার কথা 

-তখন আমি এবং বীণা সবে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়েছি।একমাস মতো স্কুলে গেছি।সকালে শুরুর ক্লাসে হেড স্যার সবার রোল কল করে।একে একে সবাই দাড়িয়ে ইয়েস স্যার বলে কিন্তু এই ১ মাস ধরে আমি ভূলের মধ্যে আছি।আমি মনে করি সবাই হেড স্যার বলে জবাব দেয়।একদিন হলো কি হেড স্যার থানা সদরে কি একটা অফিসিয়াল কাজে গেছেন।আমাদের ক্লাস নিবেন গৌর বাবু যিনি স্কুলে ফোর্থ স্যার নামে পরিচিত।আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম রোলকল করার সময় সবাই ভূল উত্তর দিচ্ছে,একে একে সবাই জবাব দিচ্ছে হেড স্যার।সবাই ভূল করলেও আমিতো আর ভূল করতে পারিনা।আমার নাম ডাকার সাথে সাথে আমি দাড়িয়ে জবাব দিলাম"ফোর্থ স্যার"।স্যার রোল কল থামিয়ে দিলেন,আমার দিকে তাকালেন শান্ত ভাবে বললেন এদিকে আয়।আমি মনে করলাম সবাই ভূল করছে যেখানে, সেখানে আমি সঠিক বলেছি,পুরস্কার কিছু একটা পেতেও পারি।বুক ফুলিয়ে স্যারের টেবিলে গিয়ে হাজির হলাম।আচমকা আমার গর্দান ধরে নিচের দিকে চেপে পিঠের উপর দুম করে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে টেবলের নিচে মাথাটা ঢুকিয়ে দিলেন।গর্জন দিয়ে বলে উঠলেন-

আমার সাথে ফাজলামো হচ্ছে?ফাজিল কোথাকার,বেতিয়ে লাল করে ফেলবো আজ।আমি হতভম্ব এটা কি হলো পুরস্কারের বদলে তিরস্কার ।ক্লাস শেষ হলে বীণা আমার ভূলটা ধরিয়ে দিলো।বীণা এখনো তেমনই বুদ্ধিমতী আর আমি বোকাই রয়ে গেছি।

ওর আর আমার সম্পর্ক যখন অনেক গভীর বলে আমার মনে হচ্ছিল তখন আমি একটা কান্ড করে বসি।সে বছর আমাদের SSC পরীক্ষা।আমি অনেক যত্ন করে বীণাকে একটি প্রেম পত্র লিখলাম।বীণা কি করলো জানেন?সেই চিঠি আমার বাবাকে দিয়ে দিলো।কি মারটাই না খেলাম বাবার হাতে।তখন আমার খুব অভীমান হয়েছিল যে আর কখনোই বীণার সাথে কথা বলবো না।কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা পূরন হয়নি।কথা বলতে বলতে বাড়ীর কাছে এসে গেছি।কিছুটা সামনে এগুলে আমার বাড়ী তার থেকে দু'শ গজ পার হয়ে বামের রাস্তা ধরে অল্প কিছুদূর গেলেই বীণাদের বাড়ী।আমি বললাম-এতোদুর একসাথে এলাম কিন্তু এতো রাতে তুই কোথা থেকে এলি,কেন এলি কিছুইতো জানা হলোনা।বীণা বললো- তাহলে তুই যা, কাল বাড়ীতে আসিস সব বলবো।

-এখান থেকে কিভাবে যাবি?

-বিলের ভীতর দিয়ে সর্টকাট মারবো।বীণা জবাব দিলো

-আরে ওটাতো শ্বশান ঘাট,দিনের বেলায়ও ওদিক দিয়ে কেউ যায় না।ঐ শ্বশানে ভূত প্রেতের 

আড্ডা-তুই জানিস না?

-আমি তো নিজেই একটা ভূত-প্রেত।আমার কাছে কেউ আসবে না।তুই যা সকালে দেখা হবে।বলেই ও যাবার জন্য পা বাড়ালো।

- তাহলে চল আমি পৌছে দিয়ে আসি।ও এবার আমার দিকে ঘুরে দাড়ালো।

বললো-সামনে বাঁশের শাঁকোটা ভাঙ্গা, আমার শাড়ীটা গায়ে শুকিয়ে গেছে।এটাকে আর 

ভেজাবো না।এটাকে হাতে নিয়ে খাল সাঁতরে পার হবো।তুই সামনে থাকলে কি পারবো?

আমি বললাম তার দরকার কি সোজা রাস্তায় চল।আমি তোকে বাড়ী পর্যন্ত পৌছে দিয়ে আসি।

আমার কথা শেষ হবার আগেই বীণা রাস্তা থেকে নেমে বাম পাশে বিলের মধ্যে দিয়ে হাটা শুরুকরলো আর মুহুর্তেই অন্ধকারে মিশে গেলো।


পরদিন সকালে আমার ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরী হলো।কাল রাতে বড় একটা ধকল গেছে।তবে সকালে বেশ ফুরফুরে মেজাজ।বীণাদের বাড়ীতে গিয়ে ওর সাথে দেখা করতে হবে।"মন ছুটেছে তেপান্তরে" এমনই অবস্থা তখন আমার।তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে নাস্তা শেষ করে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে।বীণাদের বাড়ীতে যাবার রাস্তায় ঢুকতেই অরুনের সাথে দেখা।অরুন বীণার জ্যাঠার ছেলে।ওদের একান্নবর্তী পরিবার।দু'ভায়ের এক ব্যাবসা,একসাথে, চাউলের আড়ৎ।বড় ভায়ের এক ছেলে এই অরুন আর ছোট ভাইয়ের এক মেয়ে বীণা।মনে হবে আপন ভাই-বোন-পিঠোপিঠি দু'সন্তান।

আমরা একই বয়সী,বন্ধুও বটে।ও আমাকে পেয়ে ভীষন খুশি,টেনে পাশে বসালো।নরম ঘাসের উপর বসে পড়লাম।তোর খবর বল অরুন,- এখন কি করছিস?

-কি আর করবো,বাবার চালের আড়তে পার্ট টাইম।

- আর ফুল টাইম তোর ক্লাব আর বন্ধু-বান্ধব? আমি বললাম।

ও একটা দীর্ঘসাস ছেড়ে বললো

-নারে ,বীণা চলে যাবার পর আমাদের বাড়ীর লক্ষীও ওর সাথে চলে গেছে।

- বীণা কোথায় চলে গেল?-কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

ও বেশ কিছুক্ষন নীরব থেকে আমার মুখের দিকে তাকালো।বললো তুই কিছু জানিস না,কারো কাছে কিছু শুনিসনি বীণার ব্যাপারে?

-না, আমি বললাম।

ও মাথা নিচু করে নখ দিয়ে কয়েকটা ঘাসের আগা ছিড়ছে,নীরব।আমি ওকে কনুই দিয়ে একটি খোচা দিয়ে বললাম

 -কি হলো বল।

ও এবার বলতে শুরু করলো

-তুই তো জানিস বীণা খুবই ভালো ছাত্রী ছিলো।SSC পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাতে আমরা সবাই খুব খুশী ছিলাম।তুই চলে গেলি শহরে,তাই কিছু জানিস না।বীণার বিয়ে ঠিক করলেন কাকু,বাবাও মত দিলেন।কিন্তু বীণা বেকে বসলো,সে আরো পড়তে চায়।শুরু হলো সংসারে মহা ঝামেলা।বুদ্ধিমতী আমার বোনটা সব কিছু মেনে নিয়ে,বড় ত্যাগ স্বীকার করে শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিড়িতে বসলো।কিন্তু যার সাথে বিয়ে হলো সে ছিলো একটা জানোয়ার।আমার বোনটাকে বাপের বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে দেবার জন্য চাপ দিতে শুরু করে।প্রথম দিকে বীণা তার বুদ্ধীমত্তা খাটিয়ে এটাকে সামাল দিতে চেষ্টা করে।কিন্তু পারে না।আমাদের কাউকে একথা সে কোন দিনই বলেনি।কাউকে বুঝতেই দেয়নি যে সে এতো বড়ো সমস্যার মধ্যে দিয় যাচ্ছে।

একদিন গভীর রাতে বীণা বাড়ীতে এলো,কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত চেহারা।বাড়ীর সবাই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো।এতো রাতে একা কোথা থেকে এলি?জামাই কোথায়?সে সাথে আসেনি কেন? বীণা শুধু একটি কথা বললো।এখন কোন কথা বলবো না,এখন আমি ঘুমাবো তোমরা যাও কাল সকালে সব বলবো।বলেই দরজা বন্ধ করে দিলো।

অরুন এবার চুপ,আমি ওকে আবার কনুয়ের খোঁচা দিলাম

-শেষ কর বললাম আমি

কিছুক্ষন চুপ থাকার পর যা বললো তাতে আমার কি অবস্থা হলো বলে বোঝাতে পারব না।আসুন ওর মুখেই শুনি।

-ঐ রাতেই একেবারে শেষ দিকে আনুমানিক ভোর ৪টার দিকে কে যেনো আমাদের সদর দরজায় কড়া নাড়ছে।আমি তখন ঘুমে,,শুনতে পাইনি।মায়ের ধাক্কা-ধাক্কিতে ধড়-মড় করে উঠে বসলাম।মা বললেন সদর দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে খুলে দেখ মনে হয় বীণা রাগ করে বাড়ী থেকে চলে এসেছে বলে জামাই এতো সকালে হাজির হয়েছে।

আমি চোখ ডলতে ডলতে গেট খুলে তো আক্কেল-গুড়ুম,এতো দেখি পুলিশ।আমাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে তারা ১০/১২ জন বাড়ীর ভীতরে ঢুকে পড়লো।ভেতরে ঢুকেই গড গড কর প্রথমেই বাবার কামরায় ঢুকে পড়লো অফিসার গোছের লোকটা। বাবার সাথে ওসি সাহেবের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শোনা যাচ্ছে বাইরে থেকে।কি নিয়ে তর্ক হচ্ছে বোঝার জন্য আমি একটু কাছে এগিয়ে গেলাম।সেই বিতর্ক ছাপিয়ে দক্ষিন দিক থেকে কানে এলো মহা শোরগোল আর কাকিমার বুকফাটা আর্তচিৎকার।

বীণার নিথর দেহ নিম গাছ থেকে নামানো হচ্ছে।পুলিশ ধরাধরি করে লাশ নামাচ্ছে।ফাঁসীর দড়িটা গলার মধ্যে অনেকটা বসে গেছে।শরীর শক্ত হয়ে গেছে।বিভৎস চেহারা।লাস কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

একটু থেমে অরুন আবার বলতে শুরু করলো।অরুন বললো-বীণা ওর স্বামীকে খুন করে পালিয়ে এসেছিলো সে রাতে।


-এটা কতদিন আগের ঘটনা অরুন?

-অনেক আগের, তিন বছরের কিছু বেশী হবে।

তারপর দু'জনেই চুপ।আমি তখন কাল রাতের ঘটনা গুলো ভাবছি।কিভাবে হলো?কেন হলো?কাল রাতের ঘটনা তো মিথ্যা নয়।তবে একথা কাউকে বললে সে কি বিশ্বাস  করবে?মনে হয় না।আমি গতকাল রাতের কথা অরুনকে সেদিন বলিনি শুধু অরুন কেন এতো বছর কাউকে বলিনি।এই ঘটনা একান্তই আমার, এই ভয়ংকর সুখস্মৃতি শুধুই আমার হয়েই থাক ।কাউকেই শেয়ার করতে চাইনি।

আমার বুক থেকে শুধু একটা দীর্ঘস্বাস বেরিয়ে এলো।উঠে বাড়ীর দিকে হাটতে শুরু করলাম প্রচন্ড বেগে বাতাশ বইছে পূবদিক থেকে।শোঁ শোঁ সব্দের সাথে যেন কারো কান্না মিশে ম্রিয়মান এ প্রকৃতি।চলতে চলতে সে কান্না মিশে যায় আকাশের নীল সরোবরে।আমি হতবাক হয়ে চেয়ে থাকি অনিমেষ।

সমাপ্ত।




সোমবার, ২ অক্টোবর, ২০২৩

একচল্লিশ নম্বর





(একটি বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনে)


এম,আমিনূর রহমান।



সরফরাজ এখন কিছুকিছু বাংলা শিখে ফেলেছে।অনেক কথাই সে এখন বাংলায় বলতে পারে, একেবারেই বাংলা বলা ঠিক হবেনা বাংলা,উর্দু, ইংরেজী মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ী।কমলা তাকে বাংলা শেখায়।প্রতিটা কাজে,প্রতিটা পদক্ষেপে তাকে বাংলা ভাষা,বাংলাদেশের আচার-ব্যাবহার শেখাবার তার যেন প্রানান্ত চেষ্টা।এক মাসের কিছু কম-বেশী সময় হলো দু'জন একসাথে আছে,একে অপরের পরিপুরক।একজনকে ছাড়া অন্যজন যেন অস্তিত্বহীন।কমলা তাকের উপর থেকে রাইফেলটি বের করে,একটা ছেড়া গামছা দিয়ে অস্ত্রটি পরিস্কার করতে থাকে।মনে মনে ভাবে মানুষটি পাকিস্তানি সেনা হলেও মনটা ভীষন ভালো দু'এক দিন তার সাথে কেউ থাকলে তাকে ভালবেসে ফেলবে।তার প্রেমে পড়ে যাবে।কমলাও কি তাহলে সরফরাজ খানের প্রেমে পড়ে গেছে? কমলা মনে মনে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, হয়তোবা সে জানেনা।

দু'সপ্তাহ প্রায় কমলা সরফরাজের হাতকড়া খুলে দিয়েছে এখানে পালাতে পারবেনা,চারিদিকে উত্তাল সমুদ্র, দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি।যেদিকে তাকাও ঢেউ ছাড়া কিছু নেই।এতোদিন হয়ে গেল একটি নৌকারও দেখা পাওয়া গেলনা।বর্ষাকালে কেউ আসেনা এদিকটায় শুধু শীতের সময় এই দ্বীপে মাছ ধরে শুটকি করতে কিছু লোক আসে আবার বর্ষাকাল শুরুর আগেই পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলে।এখানে তাদের ঘর এবং পরিত্যাক্ত ব্যাবহার্য জিনিষপত্র দেখে তাই মনে হয়।নৌকাডুবির পর যখন কমলার জ্ঞান ফিরলো সে দেখলো সরফরাজ তার চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে।

হাবিলদার বেলাল ছিল তাদের দলের অধিনায়ক,মাঝির দায়িত্ব পালনকারি ছোকড়া আগরতলা ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং শেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলে যোগ দিয়েছিল।নতুন এই ছেলেটির নাম মনে করতে পারলোনা কমলা।তাদের তিনজনের উপর দায়িত্ব ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে বন্ধি পাকিস্তানী সেনা সরফরাজ খানকে চট্টগ্রাম শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ক্যাম্পে পৌছে দেয়া।ক্যাম্পের অন্য সবার মতামত ছিল সাগরপাড়ে ঐ সেনাকে দাড় করিয়ে একটা গুলি খরচ করেই ল্যাঠা চুকে যেত, কিন্তু তা হলো না বেঁচে গেল সরফরাজ খান।মেজর রাহাতের সিদ্ধান্তের ফলে সন্ধার দিকে হাতিয়া দ্বীপ থেকে নৌকা ছাড়লো বন্দিকে নিয়ে তারা তিনজন।উদ্দশ্য চট্টগ্রাম।ঝড় শুরু হলো সম্ভবত শেষ রাতের দিকে তারপর আর কিছু মনে নেই তার।হাবিলদার বেলাল আর নতুন ছেলেটির আর কোন খোজ মেলেনি।সাগরে ডুবে মারা গেছে হয়তো।ছোট্ট এই দ্বীপের পুরোটাই খুজে দেখা হয়েছে,তাদের হদিশ মেলেনি।এই কুড়ে ঘরটি সহ অনেক টুকিটাকি জিনিষ তারা পেয়েছে ভাগ্যের সহায়তায়।পানির পাত্র,সাগরের পানি থেকে খাবার পানি তৈরীর কিছু দেশী উপকরন,প্রায় তিন ডজন দেয়শলাই,বালিশ,কাথা,মোমবাতি,রান্নার সরন্জাম,রান্নার কিছু মসলা আরো কত কি।সংসার চালাতে তাদের শুধু মাছ আর পাখী শিকার করেভালই চলছে।আর এ বিষয়ে সরফরাজ এখন ভীষন এক্সপার্ট।রাতের বেলা তার শিকারের নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশলের লোমহর্ষক গল্প যখন বালিশে গা এলিয়ে দিয়ে সরফরাজ বলতে থাকে কমলা তখন তন্ময় হয়ে শোনে, মনে হয় এতো ভালো আর প্রানবন্তু কাহিনী সে জীবনে আগে কখনোই শোনেনি।

রাইফেলটার গায়ে হাত দিলে কমলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যায়।নলডাঙ্গার যুদ্ধে একাই নয় জনকে খতম করেছে কমলা,তারপর থেকেই সবার নজরে পড়েছে সে।মেজর সাহেব তখন থেকেই অনেক বড় বড় অপারেশনে কমলাকে অন্তরভুক্ত করেছে কমলাও তার বিশ্বাসের প্রতিদান দিয়েছে।প্রতিটা অপরেশনের পর কমলার গুনতি বাড়তে থাকে,এখানে আসার আগ পর্যন্ত তার কাউন্ট ছিল ৪০ অর্থাৎ এ যাবৎ সব মিলে তার শিকারের সংখ্যা ৪০ জন তার মধ্যে ৩৭ জনই পাক সেনা।এক এক জনকে খতম করে আর উচ্চস্বরে নম্বর কাউন্ট করে,এটা তার একটা আলাদা বৈশিষ্ট,আলাদা পরিচয় তৈরী করে দলের মধ্যে।

প্রথম যখন সে ক্যাম্পে আসে তখন তিনজনকে মেরে নদী সাতরে কুলে উঠে মুক্তি বাহিনির হাতে পড়ে। যাদেরকে সে মারে তার মধ্যে একজন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জাদরেল কর্নেল।সে রাতে গানবোটের যার খাস কামরায় কমলাকে বাড়ী থেকে তুলে এনে গনিমতের মাল বলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল।তাকে কাবু করতে কমলার এতোটুকু বেগ পেতে হয়নি কারন সে ছিল পাড় মাতাল।গার্ড দু'জন একটু ঝামেলা করেছিল কিন্তু হাতের কাছে একটি বড় মুগুর ধরনের অস্ত্র পেয়ে যাওয়াতে তার সামনে আর দাড়াতে পারেনি কুকুর দুটো।পরপর দু'টো ঝুনো নারকেল ভাংগার মত সব্দ হতেই সব শেষ।বাইরে যখন সৈনিকদের দৌড়ে আসার সব্দ শুনলো কমলা তখন কামরার জানালা দিয়ে নদীতে ঝাপ দিল।তার পর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।ট্রেনিং নিয়েছে,সপথ নিয়েছে দেশের জন্যে উৎসর্গ করবে তার প্রান।সেই সপথ থেকে সে একচুলও কখনো নড়বে না তাই তার যতো ক্ষতিই হোক না কেনো।এই সপথ সে ভাংবে না কোন দিন।কমান্ডিং অফিসারের আদেশ যে করেই হোক সে পালন করবে এটা তার দায়িত্ব।যে ভাবেই হোক বন্দিকে সে চট্টগাম ক্যাম্পে পৌছে দেবেই।


রাত হয়েছে,জনমানব শুন্য দ্বীপে সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়না।ছোট্ট দ্বীপটির এক পাশে ঝোপঝাড় এবং কিছু লম্বা লম্বা গাছপালা আছে।এদিকটায় খাড়া খাদ পানির গভীরতা বেশী কোন বালুচর নেই।অন্য তিন পাশে বেলাভূমি এই তিন পাশে বাঁশের মাথায় কাপড় টানানো হয়েছে।কোন মাছ ধরার নৌকা যদি এই নিশান দেখে তাহলে বুঝবে এখানে কেউ আটকা পড়ে আছে তারা উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।সরফরাজের এই বুদ্ধি প্রথমে কমলা মানতে চায়নি ভেবেছিল এর মদ্ধে কোন কু-মতলব আছে,পালানোর ধান্দা কিনা।পরে ভেবে দেখেছে না তেমন কিছু না। তখন থেকেই এই নিশান উড়ছে কিন্তু কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।কোন নৌকাও তাদের নজরে পড়েনি এতোদিনে।সরফরাজ বাইরে বসে একটা ভাঙ্গা হাড়িকে তবলা বানিয়ে গান গাইছিল,দেখে কমলা হাসে,তার সরলতা কমলার ভালো লাগে লোকটার মাঝে কোন টেনশন নেই।এই নির্জন দ্বীপে তারা দু'টি প্রানি আটকে পড়ে আছে এতোদিন,তা বলে কোন ক্ষোভ নেই,চিন্তা নেই সব সময় যেন ফুর্তিতে আছে।মজার মজার গল্প বলে হাসায় আর নিজে প্রান খুলে হাসে।ভালোই চলছে তাদের টুনাটুনির সংসার। কমলা সরফরাজকে খেতে ডাকে বলে এবার থেকে দিনের আলো থাকতে থাকতে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে।মহারানীর এ আদেশের হেতু জানতে পারি কি?লম্বা কুর্নিশ করে সরফরাজ জিগ্যেস করে।সরফরাজের অঙ্গভঙ্গি দেখে কমলা হেসে খুন।কিছুক্ষন পর হাসি থামিয়ে বলে এখানে যে মোমবাতিগুলো ছিল তা প্রায় শেষের দিকে আর কিছুদিন পর অন্ধকারে থাকতে হবে।টেনশন মাৎ লো ইয়ার........।কমলা শাসন করার ভঙ্গিতে সরফরাজের দিকে তাকায় সরফরাজ ক্ষমা চাওয়ার মত হাত যোড় করে,বুঝেছে বাংলায় বলতে হবে।কমলা হেসে ফেলে। শুধু মাছ আর পাখির মাংস খেয়ে কতদিন বাচা যায় সরফরাজের চাই রুটি আর কমলার চাই ভাত।কিন্তু এভাবেই বেচে থাকতে হচ্ছে।কিছুই করার নেই কিছু জংলী ফল দ্বীপের উত্তর দিকের খাড়ির ধার থেকে কমলা আজ সংগ্রহ করছে,সেগুলো সরফরাজের সামনে এনে রাখে বলে খাও রুটিতো দিতে পারবো না এগুলোই রুটি মনে করে খাও।সরফরাজ কমলার মুখের দিকে তাকায় বলে তুমিতো কিছুই খাওনি এসো তোমাকে খাইয়ে দেই কমলা কাছে সরে আসে মোমবাতির স্নৃগ্ধ আলোয় সপ্নাতুর লাগে সব।সরফরাজ কমলার মুখে তুলে দেয় একটি ফল মৃদুস্বরে বলে ভাত মনে করে খাও।কমলা আবেগ ধরে রাখতে পারে না,চোখে জল চলে আসে।

ছোট বেলায় একবার সারাদিন ভাত না খেয়ে ছিলো কমলা বাবার উপর রাগ করে।বাবা সেদিন খুব বকেছিল দুর্গা প্রতিমার গলার আর শাড়ীর ভাজগুলো সঠিক ভাবে তুলতে পারেনি বলে।সেবার অনেকগুলো দুর্গা প্রতিমার অর্ডার হয়েছিল। বাবা বলেছিল এই পাল বাড়ীর মান সন্মান তোমার জন্য আজ যেতে বসেছে।আজ থেকে তোমার ভাত বন্ধ।নবীন জ্যাঠা দাওয়ায় বসে বললেন শোন যতিন,  পাল বাড়ীর মেয়ের দাম লাখ টাকা এবার পারেনি তাতে কি হয়েছে এর পর ঠিকই পারবে।বাবা বললেন না দাদা ও কোন দিনই পারবে না ওর হাত দেখছ তুমি? ওটা কি শিল্পীর হাত? ওটাতো বকসিং খেলা হাত শিল্পীর হাত হতে হবে নরম,মোলায়েম তবেই না সেই হাতে প্রতিমা স্বয়ং ধরা দেবে।পরে বাবাই অনেক সাধাসাধি করে গভীর রাতে কমলাকে ভাত খাওয়ায়।কমলা একটা বড় দীর্ঘস্বাশ ফেলে,সেই সব্দে সরফরাজ কমলার দিকে তাকায় কমলাও সরফরাজের দিকে তাকায় দু'জনেই মুচকি হাসে যেন দু'জনের সুখ-দুঃখ চোখের চাহুনী আর মুচকি হাসিতে ভাগাভাগী করে নেয়।

সেদিন সকালে খাড়ীর দিকটায় মাছ ধরছিল সরফরাজ একটু দুরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিছু ফলমূল জোগাড়ে ব্যাস্ত ছিল কমলা এমন সময় এলো বিপদ,সরফরাজের চিৎকারে তখন নির্জন দ্বীপ কম্পিত।তার ডান পায়ে কামড় বসিয়েছে কুমিরটা এবং ক্রমাগত গভীর জলে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।কিছুতেই পা ছাড়াতে পারছেনা সে।কমলা ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠলো এই দৃশ্য দেখে,কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।হাতের ছোট ঝুড়িটা ফেলে দিয়ে ঝাপিয়ে নামলো কোমর জলে কিছু না বুঝেই দু'হাত দিয়ে মেছো কুমিরটাকে এক হেচকা টানে জলের উপর তুলে ফেললো।ততক্ষনে কুমিরের মুখ থেকে পা ছুটে গেছে সরফরাজের।কুমির ছেড়ে এবার সরফরাজকে টেনে তুললো ডাঙ্গায়,ভয়ংকর উত্যেজনায় হাত পা কাঁপছিল কমলার।বিপদ কেটে গেছে এবার যেন মুহুর্তে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো কমলা বললো যদি তোমার সত্যি একটা কিছু হয়ে যেত?আহত সরফরাজ কমলাকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেবার চেষ্টা করে।সরফরাজের পায়ের ক্ষতটা বেশ গভীর।জঙ্গল থেকে লতাগুল্ম এনে বেটে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে।কিন্তু জ্বর খুব বেশী বলে মনে হচ্ছে।বেলা যত পড়ছে জ্বর তত বাড়ছে,সন্ধার দিকে সরফরাজ জ্ঞান হারলো প্রবল জ্বরের কারনে।এদিকে একফাকে কমলা কয়েকটি বুনো আনারস আর লেবু সংগ্রহ করেছে যা জ্বর কমাতে সাহায্য করবে।এখানে তো ডাক্তার বা ওষুধ নেই এগুলোর উপরই ভরসা করতে হবে।সারারাত কমলা সরফরাজের মাথার কাছে বসে জলপট্টি দিতে লাগলো।এক ফোঁটা ঘুম নেই তার চোখে। সকালের দিকে জ্বরটা একটু কম মনে হলো।আজ কমলা নিজে কিছু মাছ ধরেছে।জ্যান্ত মাছের ঝোল খাওয়ালে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে সরফরাজ।হলুদ বেটে ক্ষতস্থানে বান্ডেজ করা হয়েছে।যত্নের কোনো কমতি নেই কমলার,পুরোদস্তুর এক বাঙ্গালী গৃহবধু যেন।


পায়ের ব্যাথাটা কয়েকদিনেই ধীরে ধীরে কমে গেল সরফরাজের।এ কয়দিন কমলার উপর দিয়ে খুব ধকল গেছে।সংসারের সব কাজ একা সামাল দিতে হয়েছে উপরন্তু সরফরাজের গোছল করানো,খাওয়ানো থেকে শুরু করে যাবতীয় কিছু কমলাকে করতে হয়েছে।এখন সরফরাজ পুরোপুরিই সুস্থ। রাত্রে বালুচরে শুয়ে সরফরাজ লাহোরের কোন এক গ্রামের তার ছেলেবেলার গল্প বলছিল আর কমলা সরফরাজের মাথার চুলের মধ্যে আঙ্গুল চালাতে চালাতে মুগ্ধ শ্রতা হয়ে শুনছিল।আকাশে পূর্ণ চাঁদ,মেঘমূক্ত আকাশ,বিস্তির্ন জলরাশী পরিপূর্ণ চারিধার,মৃদুমন্দ বাতাশ সে এক মনমূগ্ধকর পরিবেশ।যখন সে তার বড় ভায়ের বিয়ের মজার কাহিনী শোনাচ্ছিল তখন কমলা ভাবলো সরফরাজকে বলবে সে যেন তার জন্যে এক কৌটা শিঁদুর যোগাড় করে দেয়।গাঢ় লাল রক্তের মত সিঁদুর,তাদের বিয়েতে লাগবে।কমলা কল্পনায় তার আর সরফরাজের বিয়ের কাহিনী কল্পনা করতে করতে আনমনা হয়ে যায়।হারিয়ে যায় কোন অজানায়।সরফরাজ আঙ্গুলের খোচা দিয়ে সম্বিৎ ফেরায়,কমলা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।


সকালে চিকচিকে রোদ উঠেছে।নীল সমুদ্র আজ কার জন্যে এতো সেজেছে অবাক হয়ে দেখে কমলা।সরফরাজ উত্তর দিকে সমুদ্রে মাছ ধরছিল। সেখান থেকে উল্লাশ আর চিৎকার করতে করতে ছুটে আসে।পাল তোলা একটা নৌকা দেখা গেছে।কমলাকে দেখানোর চেষ্টা করে। কমলা কেন যেন খুশী হতে পারেনি।নৌকার দৃশ্যটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।এবার মনে হয় নৌকার আরোহীরা তাদেরকে দেখতে পেয়েছে,দ্বীপের দিকে নৌকা ঘুরিয়েছে।বেশ কাছে এসে পড়েছে নৌকাটা আরোহী তিন জনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তিন জন পাকিস্তানী সৈনিক তারা যেন  বিদ্ধস্ত,পোষাকগুলো ছেড়া,গায়ে ময়লা,কোন যুদ্ধে পরাজয়ের পর পালিয়ে এসেছে মনে হয়।সরফরাজ আনন্দে আত্মহারা দু'হাত সামনে বাড়িয়ে ছুটে চলেছে নৌকার দিকে-ইয়ে মেরে ভাই মেয়ে ইয়ার.....

হুংকার দিয়ে ওঠে কমলা,পিছন ফিরে তাকায় সরফরাজ।কমলার হাতে তার দিকে তাক করা রাইফেল দেখে একটু ভড়কে যায় প্রথমে, পরক্ষনেই হেসেই লুটোপুটি খায়, প্রশ্নের সুরে বলে তুমি আমাকে গুলি করবে আমি মরে গেলও বিশ্বাষ করবো না।আবার ঘুরে নৌকার দিকে ছুটতে থাকে সে।কমলার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকে।নৌকাটি পাড়ে ভীড়েছে একটা কাঠের সিড়ি নামানো হয়েছে,ওরা সবাই বেশ উল্লোসিত।সরফরাজ হামাগুড়ি দিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠছে...কমলার আঙ্গুল চেপে বসেছে রাইফেলের ট্রিগারে, লক্ষ স্থির সরফরাজে মাথা বরাবর । কমলার হৃদয় ভেঙ্গে চৌচির, ট্রিগারে আঙ্গুলের চাপ বাড়তে থাকে।গগণবিদারী সব্দে চারিদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।সরফরাজ ছিটকে পড়ে যায় কাঠের সিড়ি থেকে সাগরের নীল জলে।মুহুর্তে লাল হয়ে যায় আশপাশের জল।কমলা দেখে  এক কৌটা নয় হাজার কৌটা সিঁদুর এনেছে তার জন্য সরফরাজ ।আর অভিমান করে ঢেলে দিয়েছে সাগরজলে।বুকের ভীতটা দুমড়-মুচড়ে ওঠে তার।এবারের শিকারের কাউন্ট বেরিয়ে আসে তার গলা দিয়ে অস্ফুট স্বরে.........একচল্লিশ নম্বর।


সমাপ্ত।

                                              https://wwwcreativecanvascrafts.blogspot.com/
                                                            https://journalview360.blogspot.com/
                                                   https://sites.google.com/view/epicexplorerhub


https://rb.gy/e6u3kp

  









 

রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

আষাঢ়ে গল্প




এম,আমিনূর রহমান


কৈ মাছের প্রান অনেক শক্ত একথা সঠিক তাই বলে ডুবোতেলে ভাঁজার পরও হাড়ির মধ্যে লাফাবে?এটা কেমন কথা।আবিদ তো অবাক,আবার ভয়ও লাগছে খুব।আজ সন্ধায় যখন মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে তখন আড্ডা হচ্ছিল রবীন বাবুর বৈঠক খানায় বিষয় ভূতের উপদ্রব,গল্প শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়ে গেল।ফাঁকা গ্রামের পথে একা আসতে খুব ভয় করছিল এখন বাড়ী ঢুকে আবার এই নতুন বিপত্তি।গল্পে একজন বলছিলো কৈ মাছ আর গঁজাল মাছ নাকি ভূতের খাদ্য।আর আমাদের বুয়াটাও হয়েছে তেমন,কোন বোধ-বুদ্ধি নেই।আজ আবিদ বাড়ীতে একা আর আজকেই কেন তার কৈ মাছ ভাঁজি করা লাগবে?মনে মনে রাগ লাগে আবিদের।ঐ আবার হাড়ীর ঢাকনাটা নড়ছে।আবিদ ফোনটা হাতে

নিয়ে মিজান মামাকে ফোন দিল।

-হ্যলো কে?

-মামা আমি আবিদ।

-এতো রাতে?কি হয়েছে কোন সমস্যা?

-মামা বুঝতে পারছি না সমস্যা কিনা কিন্তু আমার খুব ভয় লাগছে,কাছে গিয়ে হাড়ির ঢাকনা খুলতে সাহস হচ্ছে না।হাড়ির মধ্যে ভাঁজা কৈ মাছ লাফালাফি করছে।বিকেল বেলা কৈ মাছ ভাঁজি করে যাবার সময় বুয়া বলে গেছে-ভাই জান হাড়ির ঢাকনাটা কিছু সময় হালকা খোলা থাক একটু ঠান্ডা হলে পুরো ঢেকে দিবেন।আমি বাইরে যাবার সময় ওটা ঢেকে যেতে ভূলে গেছি এখন রাতে এসে দেখি ঢাকনা উপুড় করে ঢাকা, আর হাড়ির মধ্যে মাছ লাফালাফি করছে।

-খবরদার ঢাকনা খুলো না,নিশ্চই একটা ভূত মাছ খেতে ঢুকে হাড়ির মধ্যে আটকে গেছে।

-মামা, একটা লম্বা লাঠি দিয়ে দূর থেকে খোঁচা মেরে ঢাকনাটা খুলে দিলে কেমন হয় যাতে ভূত জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে।

-ক্ষেপেছ?এখন ঢাকনা খুলে দিলে কি হবে জানো?প্রথমে হাড়ির ভীতর থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলী বের হতে থাকবে তারপর আস্তে আস্তে সেই কুন্ডলি থেকে বেরিয়ে আসবে বিশাল বড়ো এক ভূত।এমন ঝুকি নেয়া যাবে না।আচ্ছা তুমি অপেক্ষা করো আমি আসছি বলেই মিজান মামা ফোন রেখে দিল।কিছুক্ষন পর পর ভূতটার বাইরে বেরোবার খায়েস হচ্ছে নাকি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে?একটানা চেষ্টা করছে না সে।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে ভূতের টেলি-প্যাথি ব্যাবহার করে ইতিমধ্যেই হয়তো অন্য ভূতদের খবর দিয়ে ফেলেছে মিজান মামা আসার আগেই যদি তারা পৌছে যায় তবে আর রক্ষে নেই।নিশ্চিৎ ঘাড় মটকাবে।হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে আবিরের।


ঘন্টা খানেক পর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ।আবিদের জানে পানি এলো,মামা এসেছে।তড়িঘড়ি দরজা খুলেই ভয় পেয়ে গেল সে,পিছিয়ে এলো দু'পা। কে? কে? কে আপনি? ভূতের মত চেহারার একজন লোক কালো আলখেল্লা পরে তার সামনে দাড়িয়ে মাথায় লম্বা চুল মুখভর্তি দাড়ী, হাতে একটি লাঠি আর মুখ লাগানো কাঁচের মাঝারী সাইজের বোয়েম।লোকটি আবিদের প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করলো না।

সোজা ঘরের মদ্ধে ঢুকে পড়লো।পিছন পিছন ত্রস্ত পায়ে মিজান মামা ঢুকলেন বললেন রিক্সা মিটাতে দেরি হলো-শোন্ ইনি হলেন এতোদাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভূতের ওঝা,তার নজর ফাঁকি দিয়ে পালানোর সাধ্য কোন ভূত-পেত্নীর নেই,চল্লিশ হাত মাটির নিচে থাকলেও তার রেহাই নেই। তাইতো তাকে নিয়ে এলাম এবার দেখ্ ঐ ভূতকে কিভাবে কাঁচের বোয়ামে ভরা হয়।

ওঝা এবার খুটিয়ে খুটিয়ে স্থান পর্যবেক্ষন করলেন তারপর পকেট থেকে বের করা একটি ফুলস্কেপ সাদা কাগজে উত্তর দক্ষিন নিশানা লাগিয়ে কিছু রেখা ও  সাংকেতিক  ধরনের কিছু আকিবুকি করলেন।যোগাসনে বসে চোখ বন্ধ করে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী আর কনিষ্ঠার সঙ্গমে ধ্যানস্থ হলেন।

সময় বয়ে চলেছে,টান টান উত্যেজনা, একটু পরেই ভূত ধরে বোয়ামে পুরা হবে।বেচারা ভূতের কপাল খারাপ কৈ মাছ খেতে এসে যাবজ্জীবন কারাবাস নিতে হচ্ছে।দীর্ঘক্ষন পর হুম করে হুংকার দিয়ে ওঝা চোখ খুললেন।বললেন ও ক্ষমা চাইছে বলছে এ এলাকা ছেড়ে চলে যাবে আর কখনোই এদিকের পথ মাড়াবে না।কিন্তু কোন কথায় আর কাজ হবে না তোমাকে বোয়ামে বন্দি করা হবে।

এমন সময় ঘটলো দুর্ঘটনা।একটু কাছে থেকে দেখবে বলে আবিদ দেয়ালের গা ঘেসে ওঝার কাছাকাছি আসতে চাইলো,হাতের ধাক্কা লেগে লম্বা বাসের হাতল লাগানো ঝুল-ঝাড়ুটি গিয়ে পড়লো একে বারেই হাড়ীর কানায়।স্পিন বলের মত হাড়ির ঢাকনাটি ঘুরতে ঘুরতে কয়েক ফুট উপরে উঠে গেল।একটি শোলা-ইঁদুর হাড়ির মধ্য থেকে লাফ দিয়ে মিজান মামার গায়ে গিয়ে পড়েই দিলো ভো-দৌড়।ভূত দেখার মতই চমকে উঠেই মামা জ্ঞান হরালেন।তাকে নিয়েই আবিরের সারা রাত কাটলো।শেষ হলো ভূত নাটক।


সমাপ্ত।


                                               https://wwwcreativecanvascrafts.blogspot.com/
                                                https://sites.google.com/view/epicexplorerhub                                                                                                   https://journalview360.bpot.com/logs


শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

ভূতের সাথে একরাত




                       এম,আমিনূর রহমান






সন্ধা থেকে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে থামবার নাম নেই,চৈত্র মাসে এমন বে-রসিক বৃষ্টি মেজাজটাই তিরিক্ষী করে দিল।আমার কাজটা খুবই জরুরী।দায়িত্বহীন হওয়া যাবে না তাহলে পুরো অনুষ্ঠানটাই তবে পন্ড হয়ে যাবে। নাহ্ উঠে পড়ি আমাকে শুয়ে থাকলে চলবেনা।১৯৭৮ সালের কথা বলছি।

আমাদের স্কুলে প্রতি বছর মার্চ মাসের ২৬ তারিখ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হয়,সারা দিন ধরে বিভিন্ন ক্রিড়াপ্রতিযোগীতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। ফান্ড দেয় স্কুল কতৃপক্ষ আর ব্যাবস্থাপনা করে দশম শ্রেনীর ছাত্ররা যারা অচিরেইস্কুল থেকে বিদায় নেবে।যখন নিচু ক্লাসে পড়তাম তখন মনে মনে ভাবতাম কবে এমন বড় একটা দায়িত্ব পাবো আর আজ যখন পেলাম তখন মেজাজটা সপ্তমে।আমরা ১৯৭৯ সলের SSC পরীক্ষার্থী।অনুষ্ঠানের জন্য সদর থেকে মাইক  ভাড়া করে স্কুলে পৌছে দেয়াপর্যন্ত আমার কাজ।বন্ধুরা বললো তোকে সবচেয়ে সহজ দায়িত্ব দিলাম।কত সহজ তা এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি।

তথাস্তু,আমি একদিন আগে বাড়ী থেকে লন্চযোগে সদরে এসে হাজির।সদর বলতে খুলনা শহর।সেখানে আমাদের একটা বাড়ী আছে,আমার দাদা যখন রেজিসট্রী অফিসে দলিল লেখক ছিলেন তখন জমি কিনে তিন কামরা বিশিষ্ঠ এই দালান ঘরটি নির্মান করিয়েছিলেন।আমার বড় চাচা স্হায়ী ভাবে এবাড়ীতে বসবাস করেন।তিনি সরকারী চাকুরে,ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের পেসকার।সরকারী চাকরী করেও কি এক অদৃশ্য ক্ষমতার বলে ২৮ বছরের চাকরী জীবনে একবারও বদলী হন নাই।এই রহস্যজানার আগ্রহ পেশ করেছিলাম একবার বড় চাচার কাছে ,বলেছিলেন আগে সরকারী চাকরী পাও তারপর শেখাবো।সরকারী চাকরীও পাওয়া হয়নি কৌশলটি শেখাও হয়নি।যাহোক মূল কাহিনীতে আসি একটা রিক্সা নিয়ে বাগানবাড়ী রহমান ভাইর মাইকের দোকানে পৌছালাম।রিক্সাওয়ালা মেজাজটাআরেক ডিগ্রীচড়ালো। বারোআনার ভাড়া বলে কিনা এক টাকা দিতে হবে কেমন লাগে বলুন?বৃষ্টি হলে ভাড়া বেশী,রদ্দুর বাড়লে ভাড়া বেশী,গরম পড়লে ভাড়া বেশী,আমাদের কি টাকার গাছ আছে?তর্কে গেলামনা শুধু চোখ গরম করে তাকালাম ওর দিকে তাতেই বেচারা মিইয়ে গেল।বড়ই করুনা হলো,দিলাম এক টাকা যাহ!,

বুঝলাম দিনটা আজ ভালো যাবেনা।কিন্তু এতো খারাপ যে যাবে তা আগে বুঝিনি।শেষ পর্যন্ত ভূতের খপ্পরে পড়বো ভাবলে আজও গায়ের লোম খাড়া দিয়ে ওঠে। শিঁরদাড়া বেয়ে ঠান্ডা বরফ স্রোত নামতে থাকে।আরো কয়েকবার ভূতের পাল্লায় পড়েছি কিন্তু এতো ভয়াবহ না।একবার তো ভূতের জনসভার মধ্যে গিয়ে পড়লাম,সেকি ভয়ানক বিপদ।যাক সে কাহিনী অন্য আর একদিন বলবো।রহমান ভাইর কাছে আগেই মাইক বুকিং দেয়া ছিল স্বাধীনতা দিবসে মাইকের একটু ক্রাইসেস থাকে,ঘন্টাখানেক বসার পর বিয়ে বাড়ী সেরে একটি মাইক ফেরৎ এলো সেইটাই নিয়ে রিক্সা করে লন্চঘাটে যখন পৌছালাম  তখন রাত ৯টা।সাড়ে নয়টায় লন্চ ছাড়বে কিছুটা উজান যেতে হবে তবে রাত একটা দেড়টার মধ্যেই ঘাটে পৌছানো যাবে।লন্চে উঠে পড়লাম।খুলনা থেকে গাওঘরা ঘাট স্বাভাবিক ভাবে লন্চে তিন ঘন্টা সময় লাগে।এখনকার দিনে নৌপথে কেউ যায়না,স্থলপথে এখন ৩০/৪০ মিনিট সময় লাগে।রাস্তা পাকা করা হয়েছে,ব্রীজ-কালভার্ট হয়েছে তখন এসব ছিল না নৌপথ ছাড়া উপায়ও ছিলনা।

ঠিক সাড়ে নয়টায় লন্চ ছাড়লো ততোক্ষনে বৃষ্টিটা ধরে এসেছে পুব আকাশে চৈত্রের এক ফাঁলি চাঁদ।আকাশটা পুরোপুরি পরিস্কার না কিছু সাদা মেঘ রয়েছে তবে চাঁদ ওঠাতে ভালই হলো বাড়ী চলে যাবো।গাওঘরা লন্চঘাট থেকে দু'কদম হাটলেই আমার মামা বাড়ী দুই মামীই আমাকে ভীষন যত্ন করেন।পাশেই আমার বড় খালার বাড়ী,বড় খালা আমার মায়ের চেয়ে কোন অংশেই কম যত্ব করেন না।কিন্ত কোথাও থাকতে মন চাইছে না।বাড়ী চলে যাবো।গাওঘরা লন্চঘাটে মাছের ডিপোতে মাইক আর ব্যাটারী নামিয়ে দিলেই আমার দায়িত্ব শেষ বাকিটা বন্ধুরা করবে,আমি শুধু সকালবেলা গোছল করে ক্রিচ দেয়া প্যান্ট-সার্ট পরে মাথায় একখাবলা তেল মেরে চুলের বামপাশে ত্যাড়া কেটে বাবুর মত হেলেদুলে মাঠে হাজির হবো ব্যাস্।

এবার শুধু একজন সাথী দরকার কারন দুই কিলো পদব্রজেই পাড়ি দিতে হবে তাও আবার মধ্যরাত্রে,একা যওয়া মুসকিল বটে।একবার লন্চের ডেক থেকে নিচে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম আমার গ্রামের কেউ আছে কিনা।হারিকেনের আবছা আলোয় কাউকে চেনা গেলনা তবুও ভরসা হারালাম না।কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে।খোলা কাঠের বেন্চিতে চাদর মুড়িদিয়ে আলুর বস্তা হয়ে পড়ে আছে কিছু লোক।এদের মধ্যে হয়তো আমার সাথী আছে কেউ না কেউ।রাত বাড়ার সাথে সাথে নদীর খোলা হাওয়ায় বেশ ঠান্ডা লাগছে।মা বলেছিল বাবা চাদরটা নিয়ে যা নিলাম না,এই গরমের মধ্যে চাদর নিয়ে ঘুরা যায় নাকি?মার যতো সেকেলে বুদ্ধি,মনে মনে বললাম।মুখে বললাম থাক মা চাদর লাগবে না।চাদরটা মা'র হাতে ছিলো যেন আরো কিছু বলতে চাইলো,ওটা নিতে পিড়াপিড়ি করবে ভেবে ঘুরে দাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এখন মনে হচ্ছে চাদরটা আনলেই ভালো হতো,মা কি করে যেন আমার কি লাগবে তা আগে থেকেই বুঝে যায়।লন্চের চিমনির কাছে একটু ঘেষে দাড়াই এখানে বেশ ওম লাগছে।চাঁদের আলোয় ঘড়ি দেখার চেষ্টা করলাম ঘড়ি মহাষয় বড়ই সৌখিন ১০টা ১০মিনিটেই ঘুমিয়ে পড়েছে।এটাকে নিয়ে আর পারা যায় না।এখন কি কাউকে জিগ্যেস করা যায় যে কটা বাজে? বাবুর নিজের হাতে ঘড়ি রয়েছে আবার অন্যকে সময় জিগায়,মান-ইজ্জতের ব্যাপার, সবাই বলবে ওটা ঘড়ি নাকি ঘোড়া? যত্তসব যা বাজে বাজুক একজন সঙ্গী পেলে আর ভয় নেই।

লন্চ ঘাটে ভিড়েছে।মাছের ডিপোর লোক দিয়ে মাইক নামানো হলো, মনটা হালকা হলো কিন্তুসাথে সাথে খেয়াল করলাম কোন যাত্রী নামার নেই অর্থাৎ আমার বাড়ী যাবার কোন সাথী নেই।দ্রুত চিন্তা করতে লাগলাম এখানে নামবো কি নামবোনা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে লন্চ ছাড়ার আগে।এর পরে ঘাট আছে সুরখালী বাজার প্রায় এক ঘন্টার পথ,আমার বাড়ী থেকে দুই কিলো দক্ষিনে।গাওঘরা নামলে দুই কিলোমিটার দক্ষিনে হাটতে হতো আর সুরখালী নামলে দুই কিলোমিটার উত্তরে হাটা লাগবে।তবে সুখের বিষয় সুরখালী বাজারে আমার এক বন্ধুর মুদি দোকান আাছে,সেও আমাদের সাথে SSC পরীক্ষার্থী বিশ্বনাথ অধিকারী আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু "বিশ্ব"।সারাদিন মুদি দোকান চালায় রাত্রে ঝাপ টেনে পড়াশুনা করে এবং দোকানে ঘুমায়।বাড়ী যাবার কোন সঙ্গীসাথী না পেলে ওর সাথে থাকা যাবে।অতএব সুরখালী বাজারে নামবো মনস্থির করলাম।কিন্তু সেখানেও কোন সাথী জুটল না,পোড়া কপাল।

বিশ্ব'র দোকানের ঝাপে যখন থাবা দিচ্ছি তখন মধ্যরাত অতিক্রান্ত।কোন সাড়া সব্দ নেই,কেমন ঘুমরে বাবা?জোরে জোরে আরো দু'একবার থাবা দিতেই কেউ কর্কশ গলায় হাক দিলো ক্যাডায় দোহানের দরজা ভাঙ্গে?ওরে বাবা এতো দেখি আরেক বিপদ।শেষকালে কি চুরি,ডাকাতির  মামলায় পড়ি? আমার মুখে একটা টর্চের আলো এসে পড়লো লোকটি স্যান্ডেলের চটাস চটাস সব্দ তুলে আমার সামনে এসে দাড়ালো।অন্ধকারের মধ্যে দাত বের করে হাসলো বলে মনে হলো।নিকষ কালোর মধ্যে যেন সাদা দাতের বিদ্যুৎ ঝলক।বললো ভাইজানের বাড়ী কল্যাণশ্রী না? বিশ্ব'দা তো আজকে দোকানে আসেনাই দেহেন না তালা ঝুলে?এতক্ষন খেয়াল করিনি যে দোকান তালাবদ্ধ,আমি এবার ধপাস করে বসে পড়লাম দোকানের বেন্চিতে।মনে হলো আামি তলিয়ে যাচ্ছি নিরাশার অন্তহীন গহ্বরে।আর কোন আশা নেই,আর কোন ভরষা নেই।সামনে পথে পথে ওৎ পেতে আছে ঘোর বিপদ।প্রথমে পড়বে মিনা গাজীর বাঁশতলা।যেখানে সাত সাতটা খুন হয়েছিল,তাদের আত্মারা এখনো নাকি এই বাঁশঝাড়ে বাস করে।রাতের বেলা এই পথে কেউ যায়না।আমার আব্বা একবার গভীর রাতে এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন হটাৎ তিনি দেখলেন একজন বিশালদেহী মানুষ বাম পা একটি বাঁশ গাছের উপর আর ডান পা খানা নদীর ওপারে কোনখানে গিয়ে পড়েছে কে যানে,আর মস্তক এতো উপরে যে রাতের আবছা আলোয় অনুমান করা যায়না।যদি সামনে এগুতে হয় তবে তার দু'পায়ের মাঝখান দিয়ে যেতে হবে যেটা খুবই বিপদ্জনক।তিনি ঐ মুহুর্তে না গিয়ে দু'একজন লোক ডেকে নিয়ে ঐ স্থানে যখন এলেন তখন আর কিছুই পাওয়া গেল না,সব কিছু স্বাভাবিক, ভোজবাজীর মত সব উধাও হয়ে গেছে।এ কাহিনী তিনি নিজে আমাকে বলেছেন এবং ঐ স্থানের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।তার পরে আছে "ভূতের ভিটে" মেঘমুক্ত আকাশ থাকলেও সেখানে হটাৎ হটাৎ মুষল ধারে বৃষ্টি হয়।ঐ ভিটেতে নাকি ভূত-প্রেতের নানা আনুষ্ঠানাদী হয়,আনেকে দেখেছেন।

নাইটগার্ডের কথায় চমক ভাংলো ভাইজান কি একলা যাইতে ডর লাগে? আমার তো বাজারে নাইট ডিউটি নাইলে আমি দিয়া আইতাম।আমি বললাম না না ঠিক আছে আমি একাই যেতে পারবো,তুমি চিন্তা করোনা।এখন আর এখানে বসে থাকা যায় না পাছে ও আমাকে ভীরু কাপুরুষ ভেবে বসে।বয়স আমার ষোল বছর।স্কুলে রেজিসট্রেশন করার সময় জন্ম তারিখ বলতেই হেড মাষ্টার শাহজাহান

সাহেব চশমার উপর দিয়ে আমার চোখে চোখ রাখলেন বললেন ১৮ বছরের কম হলে তো SSC পরীক্ষা দেয়া যাবে না বাবা।এর চেয়ে কম বয়সে SSCপাশ করা যায় না,তোর এক বছর বয়স বাড়াতে হবে।আমার দিকে আঙ্গুল উচিয়ে বললেন আমি নিজে এনট্রান্স পাশ করেছি ২৭ বছর বয়সে তখন আমি রীতিমত সংসারী আমার তখন দু'সন্তান,আর তোরা এতো অল্প বয়সে পাশ করে কিছুই করতে পারবি না তোদের তো ম্যাচিউরিটি আসে নাই। আমি চুপ করে দাড়িয়ে থেকে তার তেলতেলে মাথায় সিলিং ফ্যানের প্রতিবম্ব দেখছিলাম।উনি আমার সার্টিফিকেট বয়স ১ বছর বাড়িয়ে রেজিসট্রেশনে জন্য পাঠালেন।কিন্তু এখন বুঝছি সার্টিফিকেটে বয়স বাড়লেও কোন লাভ হয় নাই শিশু শুলভ ভূতের ভয়টা মনের মধ্যে দলা পাকিয়ে আছে।মনে সাহস সন্চয় করে হাটা শুরু করতে হবে।গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়ালাম।কেষ্টপুকুর পার হলেই ডান পাশে আজমলদের বাড়ীটাই শেষ বাড়ী বলা চলে,কারন পরের কয়েকটি বাড়ী রাস্তা থেকে বেশ ভীতরে।তার পর রাস্তার কোন পাশেই আর বাড়ীঘর নেই, যেন মরুভূমির মাঝে উটের ট্রেইল বেয়ে হাটছি।হনহন করে হেটে চলেছি,ঠান্ডা বাতাশ বইছে পশ্চিম দিক থেকে।নদীর হাওয়া।

কয়েক কদম সামনেই মিনা গাজীর বাঁশতলা হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দে চমকে উঠলাম পিছন ফিরে তাকালাম কেউ নেই।কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনেছি ভূল হবার নয়,হাটার গতি বাড়ালাম পায়ের সব্দটাও আমার সাথে সাথে গতি বাড়ালো।মিনা গাজীর বাঁশতলা পার হচ্ছি,পায়ের শব্দের সাথে ফিসফিস কথার আওয়াজ শুনলাম,হুট করে ঘুরে দাড়ালাম ভেবেছিলাম দুজনকে দেখবো,মাণুষ নয়তো ভূত।কিন্তু দেখলাম একজনকে তাও আবার একটি বিড়াল মানুষ নয়,ভূতও নয়।কুচকুচে কালো একটি বিড়াল,কিন্তু পায়ের সব্দ,ফিসফিস কথা? বিড়ালের তো পায়ের আওয়াজ হয়না,কথাও বলতে পারেনা।মনের ভূল?হবে হয়তো।ভূত বিষয়ে কোন কথা মনে প্রশ্রয় দেবোনা,পৃথীবিতে ভূত বলে কিছু নেই।কিছু দুষ্টু জীন আছে তারা বিভিন্ন রূপ ধরে মানুষকে ভয় দেখায় মৌলবী স্যার বলেছেন।উনি মস্তবড় আলেম,তিনি নিশ্চয় ভূল বলতে পারেন না।মনে সাহস আনার চেষ্টা করি তবুও খুব ভয় করছে,কিভাবে এতোটা পথ পাড়ী দেবো?দু'কিলোমিটার পথ মনে হচ্ছে হাজার মাইল।পথ যেন শেষ হবার নয়।

একটি তীব্র আতরের গন্ধ পাচ্ছি।আমাদের পাশের বাড়ীর 'কানা বুড়ো' মারা যাবার পর যখন গোছল শেষ করে কাফনে মোড়ানো হলো তখন এমন আতরের গন্ধ পেয়েছিলাম।অবশ্য মা আমাকে ওখানে বেশী সময় দাড়াতে দেননি ছোঁ মেরে নিয়ে এলেন আমার ছোট্ট হাত ধরে।মৃত ব্যাক্তি ছিলেন সম্পর্কে আমার মায়ের আপন নানা।কিন্তু সেই আতরের গন্ধ এখানে কেন?এখানে তো কেউ মারা যায়নি আর যদি কাউকে আশেপাশে কবর দেয়া হয়ে থাকে তবে মাটি চাপা পড়ে আতরের শুবাস এতোক্ষনে শেষ হয়ে যাবার কথা।

বিড়ালটি আমার পিছু ছাড়ছে না তাছাড়াও অদৃশ্য কেউ আমার সাথে যেন হাটছে,আমি তার স্পষ্ট পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।ঘাড়ের উপর যেন গরম নিশ্বাসঃ ফেলছে কেউ,কিন্তু পিছনে তাকাতে ভয় লাগছে।এই বুঝি ঘাড় মটকে দেয়।

এই বাঁশ তলার আশেপাশে কোথাও আকরাম মেম্বার বাড়ী করেছে বলে শুনেছি।ভীষন সাহসী মানুষ বলে মনে হলো তাকে।কোথায় তা জানিনা,রাস্তা থেকে বাড়ীটি দেখা যায়না।বিড়ালটিকে একটু বাজিয়ে দেখলে হতো আসল বিড়াল নাকি ভূতের ছদ্দরূপ।পিছন ফিরে হাতে তালি মেরে একটা দাবড় দিলাম বিড়ালটি মিঁষ্ণ আওয়াজ তুলে রাস্তার পাশে খাদে নেমে আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।কাকুতী ঝরে পড়ছে তার চোখে মুখে যেন তাকে একা ফেলে না যাই এই মিনতী যেন করছে সে।

আসলে কি তাই?নাকি এটা ভূতের একটি ফাঁদ?এভাবে অসহায় পশু সঙ্গী সেজে লোকালয়ের বাইরে নিতে পারলেই তার উদ্দশ্য সফল ঘাড় মটকাতে পারে।আমি মোটামুটি লোকালয়ের বাইরে এসে পড়েছি।মিনা গাজীর বাঁশতলা পার হয়েছি কিন্তু ভূত আমার আশেপাশে রয়েছে বলে অনুভূত হচ্ছে।এখান থেকে ডাক দিলে কেউ কি শুনতে পাবে?মনে হয় না।তার পরও একটা চেষ্টা করে দেখি।কাউকে ডাক দেয়া ঠিক হবেনা যদি কেউ ছুটে আসে তাকে কি বলবো একটা বিড়ালকে ভয় পাচ্ছি?তার'চে গান গেয়ে দেখি গলায় কেমন জোর আছে,প্রয়োজন হলে পরে হাকডাক দেয়া যাবে।গান ধরলাম "ওরে নীল দরিয়া" গানটির কোন সব্দই আমার কন্ঠ দিয়ে বের হলোনা,অদ্ভূত এক অস্ফুটঃ গোঙ্গানীর মত মৃদু কাঁপা কাঁপা আওয়াজ বের হলো গলা দিয়ে।ভীষন ভয় পেয়েছি মনে হলো।

এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছি যেখান থেকে ফেরার উপায় নেই পিছনে মিনা গাজীর বাঁশতলা,সামনে ভূতের ভিটে,পিছন থেকে ঘাড় মটকাতে পারে সামনে থেকেও আক্রমন আসতে পারে। ভূতের ভিটে পার হবার সময় পথের বাম পাশ দিয়ে হাটতে হবে যাতে কেউ হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে ডান পাশে থাকা গেটের মধ্যে আমাকে ঢুকিয়ে ফেলতে না পারে।কয়েক বছর আগে এই ভূতের ভিটের মধ্যে একটি অজ্ঞাতনামা লাশ পাওয়া গিয়েছিল।সবাই বলাবলি করছিল ভূতের কাজ,কিন্তু থানার ওসি সাহেব মানলেন না তিনি দীর্ঘ দিন তদন্ত করলেন  কিন্তু ফলাফল কিছুই হলো না।হবে কি করে?ভূতের বিরূদ্ধে থানা-পুলিশ,আইন-আদালত চলে নাকি?।

ভূতের ভিটে পার হবার সময় ভীষন তীব্র একটি আওয়াজ আমার কানে বাজতে থাকলো ঝিঝি পোকার সব্দ যেন এক'শ গুন বেশী হয়ে আমার কর্নকুহরে আঘাত হানছে।এমন অতি তীব্র আওয়াজে মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে।হটাৎ এক ঝাক বাদুড় উড়ে গেল জেট বিমানের মত সব্দ তুলে আমার মাথার সামান্য উপর দিয়ে ,পিলে চমকানো আবস্থা।মনে হচ্ছে নির্বিঘ্নে পার হতে পেরেছি,কেউ ঘাড় মটকায়নি।শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলাম,মনটা একটু হালকা লাগছে।সামনের পথটা ভীষন ফাঁকা,রাস্তার ডানে বামে কোন লোকালয় নেই দু'ধারে ফাঁকা বিল।

তৈত্রের খরতাপে মাঠ ফেটে চৌচির।সারা মাঠ স্বেতশুভ্র রং ধারন করছে,মনে হচ্ছে সমস্ত মাঠ জুড়ে কেউ চুনকাম করে রেখেছে।চৈতি চাঁদের আলোয় ভীষন মায়াবী লাগছে,দুরে নারিকেল গাছের সারির এক মনরম দৃশ্য।এক মুহূর্ত যেন ভয় থেকে বহুদূরে সরে গেলাম,এখন এক অনাবিল প্রশান্তি মনকে ছুয়ে আছে।হাটার গতি একই আছে।সামনে একটা জায়গায় একটু ভয় আছে তবে জায়গাটা আর আগের মত নেই এখন ঝোপঝাড় কেটে অনেকটা ফাঁকা করা হয়েছে।সে জায়গাটাকে সবাই বলে "পোড়ো তেঁতুল গাছ"।আমার জ্ঞান হবার পর আমি সেখানে কোন তেঁতুল গাছ দেখিনি তবে একটি বিশাল গুড়ি সেখানে পড়ে থাকতে দেখেছি।গুড়িটি দেখেই অনুমান করা যায় কত বিশালত্বের অধিকারী ছিল এই গাছটি,কোন এক ঝড়ে এটি পড়ে যায় আর পড়ে গেলে তার বিশালত্ব কি আর বজায় থাকে?তার সেই গৌরব অচিরেই জ্বালানী কাঠ হয়ে চলে গেছে মানুষের চুলোয়।পড়ে আছে গুড়িটি তার বিভিন্ন অঙ্গে বসে কৃষকরা হুকোর তামুক সাজে।ঐতো ২০০ গজ দুরেই গুড়িটি পড়ে থাকতে দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট,শুধু চাঁদের আলোয় একটু অন্যরকম লাগছে।সব সময় দিনের আলোতে দেখি বলেই হয়তোবা।মনে হচ্ছে যেন একটি ঘোড়া দাড়িয়ে আছে।


video credit-Mixkit.com 


তা তো ভালোই হলো এবার ঘোড়ায় চড়ে টকবগ টকবগ করতে করতে রূপকথার রাজকুমারের মত প্রাসাদে চলে যাবো।দাদু মাকে ডেকে ঠাট্টা করে বলবেন বৌমা তোমার ছেলে বড় হয়েছে,বিশ্ব জয় করে ফিরেছে এবার একটা রাজকন্যা দেখে বিয়ে দিয়ে দাও।নিজের সঙ্গে নিজেই হালকা রসিকতা করি।এইটুকু পথ পেরুলেই বাড়ীর আঙ্গিনা আর ভয় নেই মনে ভীষন সাহস ফিরে এসেছে।রাতের আলোতে কতকিছুই না কতো বিকৃত দেখা যায় তেঁতুল গাছের গুড়ি দেখাচ্ছে কিনা ঘোড়ার মত।দ্রুতলয়ে সামনে এগুচ্ছি তেঁতুল গাছের গুড়ি থেকে ২০ ফুট তফাতে দাড়িয়ে আমি।কিন্তু এখানে তো সত্যিই একটা ঘোড়া দাড়িয়ে আমার দিকে পিছন ফিরে।গাছের গুড়িটা গেল কোথায়?এটাও কি মানুষের চুলোয় ঢুকে গেল নাকি?এতোবড়ো গুড়ি দুই দিনে নিতে গেলে কত লোক কত ঘন্টা নিরলস কাজ করার প্রয়োজন?কোনো ঐকিক নিয়মেই আমার অংক মিললো না।

ডালমে কুছ কালা হ্যায়।খুব কাছে আসতেই আমার আত্মারাম খাচাছাড়া হবার জোগাড়,হৃদপিন্ড হঠাৎ থমকে গেল যেন,পা থেমে গেল আপনা আপনি।ঘোড়াটা জীবন্ত,নড়াচড়া করছে,হাটছে কিন্তু তার মাথা নেই।শুনেছি মুন্ডু কাটা ঘোড়া বলে এক প্রকার ভূত আছে তাদের পিঠে একজন সহিস থাকে আর তার হাতে থাকে তেল মাখানো চামড়ার চাবুক।সেই চাবুক দিয়ে সামনে যাকে পায় তাকে আঘাত করে কিন্তু এ আমাকে কিভাবে আঘাত করতে পারে,এর তো সহিসও নেই চাবুকও নেই।কালো বিড়ালটি হঠাৎ গায়েব হয়ে গেছে,তাকে আর দেখা যাচ্ছে না।এখন কি হবে?কপালে মৃদু ঘাম দেখা দিয়েছে,হাত পা অবস লাগছে,এখানেই পড়ে যাবো বলে মনে হচ্ছে।এমন সময় সাদা একটি মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিল।আধারে পূর্ণ হলো চারিদিক।একফুট দুরের জিনিষও দেখা যাচ্ছে না।হটাৎ আমার মনে পড়লো কোথায় যেনো শুনেছিলাম আগুন এবং লোহা এই দুটো বস্তু কাছে থাকলে ভূত-প্রেত নাকি আক্রমন করতে পারে না।কিন্তু আগুনতো আমার কাছে নেই আর লোহা বলতে একটা জালের গাটি কোমরে তাগির সাথে মা বেধে দিয়েছিলেন ছোটবেলায় তা কি এতোদিন আছে নাকি?হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি নাহ্ খুজে পাচ্ছি না,ব্যাস্ত সময়ে জরুরী কিছুই খুজে পাওয়া যায় না।কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।হিম-শীতল  স্রোত বয়ে যাচ্ছে আমার মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা অব্দি।ঘোড়াটার খুরের সব্দ পাচ্ছি আমার দিকেই ধীর পায়ে এগুচ্ছে।এই বুঝি আমার ঘাড়ে এসে পড়লো।আমি স্থানুর মত দাড়িয়ে আছি কোন দিকে হেলতেও ভয় লাগছে।হঠাৎ চাঁদের উপর থেকে মেঘ সরে গেল স্পষ্ট দেখলাম আমার থেকে মাত্র ৬/৭ ফুট দুরে ঘোড়াটি দাড়িয়ে আছে তার পাশে একজন শ্বেত-শুভ্র পোষাকের বলিষ্ঠ ঠেহারার বৃদ্ধ ছোট একটি গাছে হেলান দিয়ে বসে তার হাতের তরবারিতে ধার দিচ্ছে।যেন ঘোড়সওয়ার কোন যাযাবর পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য দু'দন্ড বিশ্রাম নিচ্ছে।চেহারার মধ্যে নেই কোন ক্ষোভ,নেই কোন হিংস্রতা,নেই কোন প্রতিষোধ পরায়নতা,সৌম্য শান্ত ক্লান্ত অবয়ব।যেনো কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগের  মহান কোন সৈনিক বসে আছে আমার থেকে মাত্র ১০ ফিট দুরে।আমি ভাংগা গলায় শুধালাম কে আপনি?কোথা থেকে এসেছেন?।নিরুত্তর,সে আপন মনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে,যেন শুনতেই পায়নি।

চিকন খনখনে গলার একটি অট্ট হাসি শুনতে পেলাম আমার ডান পাশের ঝোপঝাড়ের ওপাশ থেকে।একবার,দু'বার,বারবার ভৌতিক হাসিটা যেন থামছেই না।ঘোড়াওয়ালা আগুন্তুককে এখন আর তেমন ভয় লাগছে না যেমন ভয় লাগছে ঐ অদৃশ্য হাসি দায়ীনিকে।আগুন্তুকের চেহারা ভয়ংকর নয় তবে কার্যকলাপ ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে আর সেটা যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা আমি দেখতে  পারবো বটে কিন্তু হয়তো বর্ণনা করতে পারবো না,কারন বেচেঁ থাকলেই না বর্ণনা করবো সে আশাই তো দেখছি না।আমাকে চতুর্দিক থেকে তারা ঘিরে ফেলেছে।অসহায় আত্ম সমার্পন নাকি আত্বরক্ষার যুদ্ধ?কিছুই মাথায় আসছে না।হাসির সব্দটা আরো কাছে চলে এসেছে,আমার চারিদিকে অদৃশ্য আত্বারা ঘোরাঘুরি করছে,মৃদুস্বরে সোরগোল করছে কিন্তু কি বলাবলি করছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।আগুন্তুক নির্বিকার ধীর লয়ে তার তরবারি শান দিচ্ছে,জগতের কোন কিছুতেই তার খেয়াল নেই।আমার পায়ের গোড়ালী বেয়ে তিরতির করে ঘামের স্রোত নেমে যাচ্ছে।আমি নিস্তেজ হয়ে পড়ছি আত্বরক্ষার যুদ্ধ কিভাবে শুরু করবো ভাবতে পারছি না।দৌড় দিব?কিন্তু আগুন্তুকের পাশ দিয়ে যেতে হবে যদি হাত ধরে ফেলে?তারপর শুনেছি ওদের হাত ইচ্ছেমত লম্বা করতে পারে ১০ ফিট অথবা ১০০ ফিট।অন্য কোন উপায় ভাবতে হবে।সোরগোল ক্রমেই বাড়ছে যেন শত শত প্রেতাত্মা সবাই সবার সাথে একসাথে কথা বলছে অনেকটা মৌমাছির গুন্জনের মত।আমার খুব কাছে ওরা ঘোরাঘুরি করছে এক'দু ফুটের মধ্যে।ওদের চলাফেরার বাতাস লাগছে আমার গায়ে।আমি পাথরের মূর্তির মত দাড়িয়ে আছি কিংকর্তব্যবমূঢ়ঃ।হাসি কান্না সুখ দুখঃ পৃথীবির কোন কিছুই যেন আমাকে আর স্পর্শ করছে না আমি অন্য কারো বশ হয়ে গেছি,যেন অন্য জগতের মানুষ।

বাচাঁর আকাংখ্যা আমার মনের গভীরে শুধু ক্ষীণ প্রদীপ শিখার মত জ্বলে আছে কিন্তু আমার দেহ তাকে কোন সহায়তা দিচ্ছে না।হটাৎ একটা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটলো একটি কুকুরের ডাক শোনা গেলো একটু দুরে,তারপর আরেকটা,তারপর আরও একটা,কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ করে আমার দিকেই ছুটে আসছে বলে মনে হলো।অনেকগুলো কুকুর যেন একসাথে আমার দিকে ছুটে আসছে।ছুটতে ছুটতে ওরা কাছে এসে পড়েছে।আবার অন্ধকার হয়ে গেল মনে হয় কোন মেঘ আবার চাঁদকে ঢেকে দিয়েছে,ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে চাইলাম শরীর সায় দিলোনা। কুকুরগুলো বেশ কাছে এসে পড়েছে মনে হলো।অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না,এবার মনে হচ্ছে আমার সম্মোহনী অবস্থা কিছুটা কেটে গেছে।

কুকুরগুলো আমার খুব কাছে ঘোরাঘুরি করছে।ধীরে ধীরে চাঁদের উপর থেকে মেঘ সরে যাচ্ছে,আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে রূপালী ধরণী।আগুন্তুক নেই তার মুন্ডু কাটা ঘোড়াও নেই।একটি কুকুর আমার ডান হাতে টোকা দিচ্ছে,কোল ঘেষে দাড়াচ্ছে আরে এতো 'টম' আমার মামা বাড়ীর পোশা কুকুর।আমার মা যখন মামা  বাড়ী থেকে ফেরে তখন পাহাড় পর্বত ডিঙ্গিয়ে হলেও ও মা'র সাথে আসবেই,দু'চার দিন থেকে নিজের ইচ্ছায় আবার চলে যাবে।প্রথম দিকে আমাদের গ্রামের অন্য কুকুরদের সাথে ঝগড়া হতো,পরে তারাও বুঝে গেছে যে ও থাকতে বা কারো জায়গা দখল করত আসে না স্রেফ বেড়াতে আসে।এখন আমাদের গ্রামের অন্য অন্য কুকুরদের সঙ্গে ওর ভাব হয়ে গেছে।আমরা এবার বড়ীর দিকে হাটা শুরু করলাম।টম আমার ডান পাশে হাটছে।ঘাম দিয়ে যেনো আমার জ্বর নেমে গেছে।নিশ্চিৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছি।দুরে একটি কিছু দেখে টম ঘেউ ঘেউ করতে করতে দিলো ছুট সাথে অন্যরাও আমি চিৎকার করে এতো ডাকলাম কে শোনে কার কথা।আমি আসলে একা হতে চাইছিলাম না চাইছিলাম বাড়ী পর্যন্ত ওরা আমার সাথে থাকুক।কিছুক্ষন পর টম ফিরে এলো আমার গা ঘেষে হাটছে অন্য দু'একটি কুকুর একটু দুরে হাটছে,বাড়ীর গেট দেখা যাচ্ছে।গেট পার হয়ে জোৎস্নার আলোয় সাদা ধবধবে উঠোন।দরজায় টোকা দেব ঠিক তখনি মা দরজা খুলে দিল,তুমি কি জেগে ছিলে মা?একটু পরে আযান হবে আমিতো এসময়েই উঠি মা বললো।

আমার ঘরটা যেন গুমোট গরম পূব দিকের জানালাখুলে দিই।ঠান্ডা মিষ্টি হাওয়া বইছে।একটু পরেই আলো ফুটবে,রাতের ভয়ংকর আঁধার পেরিয়ে শুরু হবে সোনালী সকাল।আলোর বন্যায় ভরে উঠবে আমাদের চির চেনা এ সুন্দর পৃথীবি।দুরের মসজিদ থেকে ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে এলো,হাইওয়ালাস্ সালা-আ-আ,হাইওয়ালাল ফালা-আ-আ।


সমাপ্ত। 

                                              https://wwwcreativecanvascrafts.blogspot.com/
                                                      https://journalview360.blogspot.com/
                                                   https://sites.google.com/view/epicexplorerhub